মা হারানো একজন পুত্রের হৃদয় বিদীর্ণ করা চিঠি

প্রাপক মা

আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় মা, তোমার মৃত্যু পরবর্তী ৪০ দিন অতিবাহিত হচ্ছে আজ । আমার জন্ম পরবর্তী সময় থেকে তোমার মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তোমার বটবৃক্ষের বিশাল ছায়ায় আমার পৃথিবী ছিল প্রাণোচ্ছল ও নিরাপদ । তোমার মৃত্যু পরবর্তী ৪০ দিনের প্রতিটি রাত্রি আমার কেটেছে নির্ঘুম তোমার সাথে কাটানো সুখ স্মৃতির বোবা কান্নায় বিমূঢ় হয়ে । শোক , দুর্বিষহ যন্ত্রণা ও দুঃখের দহনে করুন রোদনে আমাদের কাটছে প্রতিটি মুহূর্ত । তোমার আদরের নাতি- নাতনিদের হৃদয় বিদীর্ণ করা প্রশ্ন ” কেন আমি তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম ..?? মাত্র দেড় ঘন্টা পূর্বে সম্পূর্ণ সুস্থ তাদের প্রিয় দাদী/ নানী হাসিমুখে তাদের আদর করে বলেছিল ” হাসপাতাল থেকে আমি একটু পরেই ফিরে আসছি ” । সেই দাদী / নানীর প্রাণহীন নিথর দেহ নিয়ে আমি কেন বাসায় আসলাম …??? জানো মা, তোমার মৃত্যুর পর , তোমার ৪৪ বছরের স্মৃতি বিজড়িত বাসায় তোমায় এক নজরে দেখতে সেই মধ্যেরাতেও ঢল নেমেছিল বিপুল সংখ্যক মানুষের । তোমার নিথর দেহ দেখে তোমার প্রিয় লাকী দিদি শিশুদের মত চিৎকার করে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠেছিল । শুধু তাই নয়, সে মধ্যরাত থেকে শুরু করে সূর্য উদয় হওয়ার পরেও বাসার সম্মুখে বসে অঝর নয়নে কেঁদে চলেছিল লাকী দিদি ।

মা তুমি তো জানো , আমার প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও কঠিন হৃদয়ের অধিকারী বাবাকে জীবনে তিনবার কাঁদতে ( দাদা- দাদির মৃত্যুর সময় ও সালাউদ্দিন চাচার মৃত্যুর সময় ) দেখেছিলাম। সেই বাবা তোমার মৃত্যুর পর প্রতিদিন শিশুর মত কাঁদে, তাও আবার প্রকাশ্যে । ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার ছদ্মবেশে থাকা মানুষরূপী অমানুষ গুলোর প্রকৃত চেহারা প্রস্ফুটিত হচ্ছে মা, তোমার মৃত্যুর পর । আজন্ম ছাইচাপা হিংসার অনল আজ তারা উগড়ে দিচ্ছে প্রকাশ্যে কোনরকম লাজ লজ্জার খামতি না রেখে। জীবিত অবস্থায় তাদের জন্য উৎসর্গীকৃত তোমার সেবা, ত্যাগ , তিতিক্ষা, মানবিক ও আর্থিক কর্মকান্ড তারা অস্বীকার করছে বুক ফুলিয়ে আড়ালে আবডালে । এইসব বেঈমান, মোনাফেক, নিমক হারামরা লিপ্ত হয়েছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে । মা, তারা ভাবছে ” বাবা আর আমি ” এখন ফুটবল তাদের জন্য । তাদের এখন খায়েস হয়েছে ইচ্ছামতো ফুটবল খেলা । কিন্তু তারা হয়তো ভুলে গেছে , সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর অশেষ রহমত, আমজনতা এবং তোমার দোয়ায় চীনের মহাপ্রাচীরের মতো ইস্পাত কঠিন ও দুর্ভেদ্য আমাদের ডিফেন্স । মা তুমি নিশ্চিত থাকো , আমার দেহের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত তোমার দোয়ায় সুরক্ষিত রাখবো এই প্রাচীর । পূর্বানুমান অনুযায়ী কালনাগিনী তোমার মৃত্যুর পরপরই ফণা তুলেছিল , আমার দূই কলিজার টুকরা কে সাময়িক বিসর্জন দিয়ে সেই ফণা চিরতরে শেষ করে দিয়েছি। মা, তুমি তো জানো বাবার ব্যাপক কর্মব্যস্ততার কারণে আমাকে ” অ ” কিংবা ABCD না শিখালেও্ আমাদের পরিবারের অন্যতম জ্বালানি শক্তি তথা ফুয়েল সার্ভিস দিত বাবা । আর মা , তুমি দক্ষ পাইলট এর মত সেই ফুয়েলকে সম্বল করে ইস্পাত কঠিন মনোবল , অবিনাশী ধৈর্য শক্তি দিয়ে বিমান তথা আমাদের নিরাপদে ল্যান্ডিং করেছেন অনায়াসেই যে কোনো পরিস্থিতিতে । তোমার কারনে আমার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষসহ অনেক রথি -মহারথীর কাছে আজ আমি শ্রদ্ধা মেশানো ভালোবাসায় সিক্ত । আমাদের বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের চালিকাশক্তি ছিলে তুমি । মানবতাবোধ, ন্যায় পরায়ণতা , আতিথেয়তা, বিবেক, ইনসাফ সমুন্নত রেখে দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেছেন এই বিশাল একান্নবর্তী পরিবার ( তোমার ভাষায় টাইটানিক জাহাজ ) ।

কখনো কাউকে খালি মুখে কিংবা হাতে ফিরিয়ে দাও নি তুমি । তাইতো তোমার মৃত্যু পরবর্তী জানাজায় অংশগ্রহণ করা রাউজান, রাঙ্গুনীয়া, হাটহাজারী , ফটিকছড়ি, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম মহানগরসহ আমাদের নিজ এলাকার লোকজনের মুখে তোমার এই নীরব আতিথিয়তা ও বদান্যতার কথা শুনে আমরা সবাই হয়েছি বিমোহিত ও অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা মাখা ভালোবাসায় পুলকিত। মা, লোকমারফত জানতে পারলাম যে ব্যক্তি এবং তার দোসররা সম্পূর্ণ সুস্থ তোমাকে মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল অক্সিজেন মাস্ক খুলে তারা এতদিন পরেও ওই কর্মস্থল মুখী হয় নি অজানা আতঙ্কে । মা তোমাকে ওরা চিকিৎসা জনিত নৈতিকতার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে নির্মম যন্ত্রনা ও কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছিল নিষ্ঠুরভাবে ।

মা, তোমাকে কথা দিলাম, সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর অশেষ রহমত এবং তোমার দোয়ায় তোমার খুনিদের বিচার নিশ্চিত করার জন্য আমার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে আমার মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত । আমাদের এই প্রতিবাদ শুধুমাত্র মা তোমার জন্য নয় , এই প্রতিবাদ আর কোন সন্তান যেন নির্মম ও পৈশাচিক কায়দায় ” মা ” কে হারিয়ে না ফেলে তা নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মৃতপ্রায় বিবেক জাগ্রত করার। মা, মাটির কবর থেকে তুমি দোয়া করো আমার জন্য তুমি বিহীন নির্মম ও নিষ্ঠুর এই দুনিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা ও তোমার দোয়ার বরকতে যেন সম্মান , মনুষত্ব, জাগ্রত বিবেক, শির উঁচু , ভালোবাসা, হালাল রিজিক নিয়ে বেঁচে থাকি । আর বাঁচলে যেন বীরের মতো বাঁচি , আর মারা গেলে যেন বীরের মতো মরি ” ।

 

ইতি নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বেঁচে থাকা তোমার আদরের ছেলে ( ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত )