মাধ্যমিক শিক্ষায় “ধারাবাহিক মূল্যায়ন”

বাদল আহাম্মদ খান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধিঃ জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সোনার বাংলা তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ও লক্ষ্য কে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে দেশ, এগিয়ে চলেছে সমাজ, এগিয়ে চলেছে শিক্ষাক্রম (কারিকুলাম)। পরিবর্তিত হচ্ছে  শিক্ষাদান পদ্ধতি। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে পাঠদান পদ্ধতি।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে শিক্ষা নীতি অনুসারে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সাধন করা। শিক্ষার্থীদের দক্ষ , সুনাগরিক ও নৈতিক গুণসম্পন্ন করে গড়ে তোলতে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০এর আলোকে শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেসিপ (সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম) নামে একটি প্রোগ্রামের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
২০১২ এর শিক্ষাক্রম এর লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশের মাধ্যমে মানবিক, সামাজিক ও নৈতিক জনসম্পদ সৃষ্টি । শিক্ষাক্রম এর লক্ষ্য অর্জন দুটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। এর প্রথমটি হচ্ছে শ্রেণিকক্ষে সক্রিয় সহযোগিতা এবং যথোপযুক্ত শিখন -শেখানো পদ্ধতি কৌশলের সুষ্ঠু প্রয়োগ এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে শিক্ষার্থীর শিখন অর্জনের মাত্রা নির্ণয় অর্থাৎ মূল্যায়ন।আমাদের দেশে দুটি পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। একটি হল ধারাবাহিক মূল্যায়ন বা গঠনকালীন মূল্যায়ন এবং অপরটি হল সামষ্টিক মূল্যায়ন। শিক্ষার্থীর শিখন কে দীর্ঘস্থায়ী ও ফলপ্রসূ করতে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ভূমিকা অপরিসীম। ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ধারাবাহিক মূল্যায়নের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু ২০১৫ সালে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট কর্তৃক পরিচালিত একটি সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় স্কুল গুলোতে প্রকৃত অর্থে ধারাবাহিক মূল্যায়ন বাস্তবায়িত হচ্ছে না।শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সেসিপ এর অর্থায়নে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের তত্ত্বাবধানে ধারাবাহিক মূল্যায়ন এর উপর শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রশিক্ষণের প্রথম পর্যায়ে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ,বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এই পাঁচটি বিষয়ের ১০০০ জন মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে মাঠ পর্যায়ের  ২৪০০০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ প্রদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমানে সারা বাংলাদেশে মাস্টার ট্রেইনাররা জেলা পর্যায়ে  পাঁচটি বিষয়ের উপর শিক্ষকদের ধারাবাহিক মূল্যায়নের প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন ।শিক্ষাক্রমে ধারাবাহিক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই ২০১২ এর শিক্ষাক্রমে ধারাবাহিক মূল্যায়নে শতকরা ২০ নম্বর রাখা হয়েছে। এখন আসুন জেনে নেই,
 ধারাবাহিক মূল্যায়ন কী , এর উদ্দেশ্য ,ধারাবাহিক মূল্যায়নের  ধরন , নম্বর বন্টন ও এর গুরুত্ব সম্পর্কে:
 ধারাবাহিক মূল্যায়ন কী :
শিখন – শেখানো কার্যক্রম চলাকালীন শ্রেণিকক্ষের অভ্যন্তরে ও বাহিরে শিক্ষার্থীদের যে মূল্যায়ন করা হয় তাকে ধারাবাহিক মূল্যায়ন বলে।
ধারাবাহিক মূল্যায়নের উদ্দেশ্য:
১# শিক্ষার্থীদের আবেগীয়, মনোপেশীজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়ন যথাযথ ভাবে করা।
২# শিক্ষার্থীদের শিখন অর্জন যাচাই করা।
৩# শিক্ষার্থীদের শিখনফলের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করা।
৪# সকল শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৫# পারগ ও অপারগ শিক্ষার্থী চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ফলাবর্তন ও নিরাময়মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৬# শিক্ষার্থীর মধ্যে মানবীয় গুণের বিকাশ ঘটিয়ে দক্ষ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
৭# শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আত্ম মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা।
ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বর বন্টন ও ধরন:
মোট ২০ নম্বর
১# শ্রেণীর কাজ- ০৫ নম্বর
২# বাড়ির কাজ ও অনুসন্ধান মূলক কাজ (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত)- ০৫ নম্বর
 নবম – দশম শ্রেণীর জন্য বাড়ির কাজ ও ব্যবহারিক কাজ- ০৫ নম্বর
৩# শ্রেণি অভীক্ষা- ১০ নম্বর
ধারাবাহিক মূল্যায়নের ধরন:
১# শ্রেণীর কাজের ধরন:
(ক) প্রশ্নোত্তর ( খ) দলগত কাজ (গ)প্রদর্শন  (ঘ)বিতর্ক (ঙ)অংকন ( চিত্র/ সারণী/ লেখচিত্র) (চ) ভূমিকাভিনয়
 ( ছ) ব্যবহারিক কাজ
(জ) শোনা ,বলা, পড়া ও লেখা (বাংলা ও ইংরেজির ক্ষেত্রে)।
২# বাড়ির কাজও অনুসন্ধান মূলক কাজের ধরন:
(ক) শিখনফলের চাহিদা অনুযায়ী
(খ) সময়ব্যাপী
(গ) চিন্তন দক্ষতা সম্পন্ন
(ঘ) হাতে কলমে কাজ করার দক্ষতা সম্পন্ন
৩# শ্রেণী অভীক্ষার ধরন:
(ক ) মৌখিক
(খ) লিখিত (বহুনির্বাচনী ও সৃজনশীল প্রশ্ন)
ধারাবাহিক মূল্যায়নের গুরুত্ব:
১# শিক্ষার্থীর সকল শিখনফলই অর্জন করানো যায় ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে।
২# শিক্ষার্থীদের শিখনফল অনুযায়ী সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়।
৩# শিক্ষার্থীদের সবলতা ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা যায়।
৪# শিক্ষার্থীদের আবেগীয়, মনোপেশীজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক মূল্যায়ন করা যায়।
৫# শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে তোলা যায়।
৬# শ্রেণিকক্ষে সকল শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাদের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়।
৭# শিক্ষার্থীদের অধিক আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলা যায়।
৮# অপারগ শিক্ষার্থীদের নিরাময়মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
৯# শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব সৃষ্টি করা যায়।
১০# শিক্ষকের শিখন- শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল পরিবর্তন করা যায়।
১১# শিক্ষার্থীদের সামষ্টিক মূল্যায়নের জন্য তৈরি করা যায়।
১২# শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আত্ম মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়।
১৩# শিখনফলের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করা যায়।
১৪# সকল শিক্ষার্থীদের সমানভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আনন্দের সহিত শিখনের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়।
১৫# সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের দক্ষ, সুনাগরিক ও মানবীয় গুণ সম্পন্ন দেশ প্রেমিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
এখন আসুন জেনে নেই সামষ্টিক মূল্যায়ন কী :
বছরের কোন একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর অথবা বছর শেষে শিক্ষার্থী যা শিখল তার যে মূল্যায়ন করা হয় তাই হচ্ছে সামষ্টিক মূল্যায়ন। এটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন নামেও পরিচিত। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পাদন করা হয়ে থাকে। এই মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে তাঁর কৃতিত্বের জন্য গ্রেট বা সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়ে থাকে। সাধারণত মাধ্যমিক বিদ্যালয় গুলোতে আমরা সাময়িক, অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই মূল্যায়ন করে থাকি। জেএসসি , এসএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে ও সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হয়। সামষ্টিক মূল্যায়নে ফলাবর্তন বা ফিডব্যাক দেওয়ার অথবা ভুল ত্রুটি সংশোধন করার কোনো সুযোগ থাকে না । তাই সামষ্টিক মূল্যায়ন কে সত্যিকার অর্থে শিখনের মূল্যায়ন বলা হয় । এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনোপেশিজ ক্ষেত্রের মূল্যায়ন করা যায় কিন্তু আবেগীয় ক্ষেত্রের মূল্যায়ন করা যায় না। এই মূল্যায়নের মাধ্যমে নিরাময়মূলক ব্যবস্থার কোনো সুযোগ থাকে না । সকল শিক্ষার্থীকে একটি পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে।
শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার্থীর আবেগীয় দিকের মূল্যায়ন খুবই জরুরী । আবেগীয় ক্ষেত্রের মূল্যায়ন করা যায় শুধুমাত্র ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে । এই মূল্যায়নের মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীকে নৈতিক গুণসম্পন্ন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলতে পারি। ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে একজন শিক্ষক প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষের ভিতরে ও বাহিরে শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন করে তাকে মানবিক গুণ সম্পন্ন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারেন।
ধারাবাহিক মূল্যায়নের গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমান সরকার  শিক্ষাব্যবস্থায় ধারাবাহিক মূল্যায়নে শতকরা 20 নম্বর বরাদ্দ করেছেন। ধারাবাহিক মূল্যায়ন শ্রেণিকক্ষে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা পর্যায়ে মাস্টার ট্রেইনারা শিক্ষকগণকে ট্রেনিং প্রদান করছেন।
বহি:র্বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোতে ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা নৈতিক গুণসম্পন্ন আদর্শ নাগরিক পরিণত হবে।
ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদানের পাশাপাশি যাবতীয় ব্যয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে সেসিপ (সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম) নির্বাহ করছে। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সেসিপ কর্তৃপক্ষকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা।
মোসা: রোকসানা ইয়াসমীন,
সিনিয়র শিক্ষক ( জীব বিজ্ঞান)।
ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাস্টার ট্রেইনার (বিজ্ঞান)।
কসবা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ,কসবা ,  ব্রাহ্মণবাড়িয়া।